জ্বালানির উৎসে নতুন বিপ্লব ভাসমান উইন্ড টারবাইন

Spread the love

ভাসমান উইন্ড টারবাইন ব্যবহার করে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়৷ যদিও এমন টারবাইন স্থাপনের কাজ এখনো ব্যয়বহুল৷ ভেসে থাকার জন্য টারবাইনের নীচে বিশাল অবকাঠামো তৈরি করা হয়, যা দুই থেকে আট হাজার টন ভার বহন করতে পারে৷ বিষয়টা অনেকটা জাহাজের মতো৷ কাঠামোর মধ্যে থাকা বাতাস এবং আকারের কারণে জাহাজ তার ওজনের চেয়ে বেশি পানি সরাতে পারে৷ এই পানি জাহাজকে উপরের দিকে ঠেলায় জাহাজ ভেসে থাকে৷ তবে টারবাইনকে পানির উপর ভাসিয়ে রাখাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়৷ আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে: পুরো জিনিসটা যেন উলটে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা৷ প্রিন্সিপাল পাওয়ার কোম্পানি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে৷ পুরো অবকাঠামো স্থিতিশীল রাখতে তিনটি স্তম্ভের প্রস্থ একেকটির একেকরকম হয়৷ এছাড়া ভারসাম্য রাখার আরেকটি কৌশলও আছে৷ কোম্পানির কর্মকর্তা অ্যারন স্মিথ জানান তারা ‘হাল ট্রিম সিস্টেম’ ব্যবহার করেন৷ ‘‘এই পদ্ধতির কারণে স্তম্ভ তিনটির মধ্যে পানি চলাচল করতে পারে- যা টারবাইনের পাখা থেকে উৎপন্ন শক্তির চাপ কমাতে পারে৷ ফলে প্ল্যাটফর্মটির অভিকর্ষ কেন্দ্র ভার্টিক্যাল অবস্থায় থাকে৷ এভাবে আমরা অবকাঠামোটি খাড়া রাখি, যা জ্বালানির সর্বোচ্চ উৎপাদন সম্ভব করে,” বলে জানান তিনি৷এই কৌশলের কারণে অবকাঠামোটি ১৫ মিটার উঁচু ঢেউ এবং হ্যারিকেনের মতো শক্তির মধ্যেও স্থিতিশীল থাকতে পারে৷ ‘হাইউইন্ড স্কটল্যান্ডের’ পাঁচটি টারবাইন ৩৪ হাজার ঘরের চাহিদার সমান জ্বালানি উৎপাদন করে৷ এই পার্কের উৎপাদনক্ষমতা ৫৪ শতাংশ৷

তুলনার জন্য বলা যেতে পারে যে, ২০১৮ সালে অফশোর উইন্ড টারবাইনগুলোর বৈশ্বিক গড় উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩৩ শতাংশ৷ ২০২৩ সালের শুরুতে বিশ্বে ১২টি ভাসমান উইন্ডপার্ক ছিল৷ এগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ১৯৯ মেগাওয়াট, যা খুবই কম৷ তবে ইউরোপ, অ্যামেরিকা ও পূর্ব এশিয়ায় সাগরের পানিতে বড় বড় পার্ক তৈরির কাজ চলছে৷ বর্তমানে সাগরের তলে আটকে থাকা উইন্ড টারবাইনের তুলনায় ভাসমান টারবাইন তৈরিতে দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে৷ অর্থাৎ দক্ষতা বেশি হলেও এটি স্থাপন করা ব্যয়বহুল৷ খরচের ৫০ শতাংশ ব্যয় হয় টারবাইন ও অবকাঠামো নির্মাণে৷ বাকিটা পরিচালন ব্যয়৷ তবে বেশি করে টারবাইন বসানো শুরু হলে খরচ কমে আসতে পারে বলে মনে করেন অ্যারন স্মিথ৷ তিনি বলেন, ‘‘শিগগিরই যে খাতে খরচ কমতে পারে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি সেটা হচ্ছে, পাঁচটি টারবাইনের প্রকল্পের জন্য আমরা যে পরিমাণ ইঞ্জিনিয়ারিং করছি, তা ১০০টি টারবাইনের প্রকল্পের জন্য করা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমান৷”ভাসমান উইন্ড টারবাইন হার্বার বা পোতাশ্রয়েও বসানো যায়৷ শুধু জাহাজে করে তাকে টেনে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে বসাতে হবে৷ বিশ্বের বৃহত্তম 16-মেগাওয়াট ভাসমান বায়ু টারবাইন, সম্পূর্ণরূপে চীনের নিজস্ব সংস্থান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তাদের ভাসমান বায়ু টারবাইনটি প্রতি বছর গড়ে 66 মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘন্টা পরিষ্কার বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম এবং এক বছরের জন্য 36 হাজার পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাবে বলে তারা ঘোষনা দিয়েছে।

ভাসমান বায়ু টারবাইন প্রায় 22 টন স্ট্যান্ডার্ড কয়লা সংরক্ষণ করবে এবং 54 হাজার টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হ্রাস করবে। সম্প্রতি পর্তুগালের প্রথম ভাসমান বায়ু বিদ্যুৎ শক্তি কেন্দ্রটির পুরোপুরি উৎপাদন সক্ষমতায় পৌঁছেছে। ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি টারবাইন যুক্ত আটলান্টিক সমুদ্রে সম্পূর্ণরূপে চালু রয়েছে এবং পর্তুগালের জাতীয় বৈদ্যুতিক গ্রিডকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করছে। ২০১১ সালে একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। আটলান্টিক সমুদ্রে পর্তুগিজ উপকূলে আগুছাদোরা অঞ্চলের কাছাকাছি এটি স্থাপন করা হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে এটি জাতীয় গ্রিডে ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে। তবে এটি বিশ্বের প্রথম ভাসমান উইন্ডফ্লোট বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তিনটি টারবাইন প্ল্যাটফর্মকে আলাদাভাবে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বৈদ্যুতিক সংযোগের মাধ্যমে পর্তুগালের উপকূলীয় অঞ্চল ভিয়েনা কাস্তেলোতে অবস্থিত পাওয়ার স্টেশনে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। আমেরিকা, এশিয়াতে মিলে বিশ্বের ১৩ টি দেশ উইন্ড টারবাইন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ইউরোপের মধ্যে পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ডেনমার্কও বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

২০১৮ সালের ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এ প্রকল্পের জন্য গঠিত উইন্ডো প্লাস এস এ কোম্পানিকে ৬০ মিলিয়ন ইউরো অনুমোদন দেয়। তাছাড়া প্রকল্প টি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (এন ই আর ৩০০) প্রোগ্রামের আওতায় ২৯.৯ মিলিয়ন ইউরো এবং পর্তুগাল সরকার থেকে পর্তুগাল কার্বন তহবিলের মাধ্যমে ৬ বিলিয়ন ইউরো গ্রহণ করে। উইন্ড প্লাস কোম্পানিটি পর্তুগালের বিদ্যুৎ সরবরাহ কোম্পানি ইডিপি ৫৪.৪ শতাংশ, ফ্রান্সের এনগেল ২৫ শতাংশ, স্প্যানিশ কোম্পানি রেপসল ১৯.৪ শতাংশ,

যুক্তরাষ্ট্রের ভাসমান বাতাস ফাউন্ডেশন বিশেষজ্ঞ প্রিন্সিপাল পাওয়ারের ১.২ শতাংশ শেয়ারের সমন্বয়ে গঠিত। আটলান্টিক মহাসাগরের অর্ধনিমজ্জিত বিশ্বের প্রথম ভাসমান টারবাইন, বায়ু শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই বৈদ্যুতিক প্ল্যান্ট এর মাধ্যমে প্রতিবছর ৬০,০০০ ব্যবহারকারীর সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে এবং পরিবেশ বিপর্যয় রক্ষার্থে প্রায় ১ দশমিক ১ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন রোধ করতে সহায়তা করবে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *